মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬

ছেলের সংসারে ঠাঁই পেতে বৃদ্ধা মায়ের আকুল আবেদন, দিলেন আত্মহত্যার হুমকি

উত্তরদক্ষিণ ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৯, ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম

ছেলের সংসারে ঠাঁই পেতে বৃদ্ধা মায়ের আকুল আবেদন, দিলেন আত্মহত্যার হুমকি

অসুস্থ বৃদ্ধা মাকে ভরণপোষণ দিতে রাজি হলেও নিজের কাছে রাখতে চান না ছেলে সাগর হোসেন (৩০)। জীবনের শেষ সময়ে ছেলের সঙ্গে থাকতে চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী মা মুন্নি খাতুন (৫০)।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) মায়ের করা অভিযোগের শুনানিতে ইউএনও সেলিম আহমেদের সামনে অভিযুক্ত ছেলে সাগর হোসেন বলেন, “আমি মাকে সঙ্গে রাখতে পারব না। স্যার, আপনি বলে দেন, আমি মাকে মাসে কত টাকা দেব। মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করব।”

অভিযুক্ত সাগর হোসেন পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার সোনাতলা গ্রামের মৃত সিরাজুল ইসলাম ও মুন্নি খাতুন দম্পতির ছেলে। তিনি উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ হিসেবে কর্মরত।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মুন্নি খাতুনের স্বামী সিরাজুল ইসলাম অনেক আগেই মারা গেছেন। তার দুই সন্তানের মধ্যে ছেলে সাগর ও এক মেয়ে রয়েছেন। মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে। ফলে, বৃদ্ধ বয়সে মায়ের প্রধান অবলম্বন এখন একমাত্র ছেলে সাগর। কিন্তু, সাগর হোসেনের বিয়ের পর মায়ের সঙ্গে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। একপর্যায়ে ছেলে মাকে নিয়মিত ভরণপোষণ দেওয়া বন্ধ করে দেন এবং নিজের সঙ্গে রাখতেও অনীহা প্রকাশ করেন।

ভুক্তভোগী মা মুন্নী খাতুনের অভিযোগ, ছেলের কাছ থেকে ভরণপোষণ ও আশ্রয় পাওয়ার আশায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করেছেন তিনি। স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হলেও তার স্থায়ী সুরাহা হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন মা। তিনি তার অসুস্থতা, অসহায়ত্ব এবং ছেলের সঙ্গে থেকে বাকি জীবন পার করার আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অভিযোগের বিষয়ে শুনানি হয়। শুনানিতে মুন্নি খাতুন ও তার ছেলে সাগর হোসেনের বক্তব্য শোনা হয়। শুনানিতে ইউএনও সেলিম আহমেদ সাগরকে তার মাকে নিজের সঙ্গে রেখে দেখাশোনা করার বিষয়ে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেন। একজন বৃদ্ধ ও অসুস্থ মায়ের শেষ বয়সের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে মানবিকভাবে সমস্যাটির সমাধান করার জন্যও ছেলে সাগরকে অনুরোধ করেন ইউএনও।

তবে, মাকে নিজের সঙ্গে না রাখার বিষয়ে অনড় থাকেন ছেলে। একপর্যায়ে তিনি ইউএনওকে বলেন, “মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করব। আমি মাকে সঙ্গে রাখতে পারব না। স্যার, আপনি বলে দেন, আমি মাকে মাসে কত টাকা দেব।”

পরে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে ইউএনও সাগর হোসেনকে কয়েকদিনের সময় দেন। এ সময়ের মধ্যে মায়ের ভরণপোষণ ও দেখাশোনার বিষয়ে একটি সমাধানে আসার জন্য তাকে বলা হয়। না হলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ বিষয়ে মা মুন্নি খাতুন বলেন, “আমার স্বামী অনেক আগেই মারা গেছে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। আমি অসুস্থ মানুষ, হার্টের রোগী। এখন আমার ছেলে ছাড়া আর কে আছে? আমি ছেলের কাছে টাকা-পয়সা চাই না। নুন-পান্তা খেয়েও যদি ছেলের সঙ্গে থাকতে পারি, তাহলে বাকি জীবনটা পার করে দিতে পারব।”

তিনি আরও বলেন, “আমি তো মায়ের অধিকার নিয়ে ছেলের ঘরে থাকতে চাই। শেষ বয়সে সন্তানের কাছে একটু আশ্রয় চাইছি। এর বেশি আমার কোনো চাওয়া নেই।”

নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম বলেন, “মা-ছেলের বিষয়টি শুরু থেকেই আমি সমাধানের চেষ্টা করেছি। তবে, কোনো কিছুতেই রাজি হন না ছেলে। আমরা স্থানীয়রা সমস্যাটি সমাধানে ব্যর্থ হয়েছি। পরবর্তীতে তার মা ইউএনওর কাছে অভিযোগ করেন।”

এ বিষয়ে সাঁথিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পর উভয় পক্ষকে ডেকে শুনানি করা হয়েছে। একজন বৃদ্ধ ও অসুস্থ মা তার সন্তানের কাছে আশ্রয় ও ভরণপোষণ প্রত্যাশা করছেন। আমরা ছেলেকে বিষয়টি মানবিকভাবে দেখার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেছি। তাকে কয়েকদিনের সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ইউডি/রেজা/রহমান

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ

Advertisement
Link copied!