প্রকাশিত: অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ০২:৫৭ পিএম
নীলফামারীতে আগাম আলু ও শীতকালীন সবজি চাষের ভরা মৌসুমে সার ও কীটনাশক সংকটের অভিযোগ উঠেছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে কৃষকদের। পাশাপাশি মানসম্মত কীটনাশকের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে বেড়েছে উৎপাদন খরচ। এতে সময়মতো ফসল আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা। তাঁদের আশঙ্কা, বাড়তি খরচের চাপ শেষ পর্যন্ত কৃষিকে লোকসানের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
কৃষকদের অভিযোগ, জেলার কিশোরগঞ্জ, জলঢাকা ও সদর উপজেলার বিভিন্ন বাজারে বিসিআইসি ও বিএডিসি অনুমোদিত ডিলারদের কাছে সার চাইতে গেলে বরাদ্দের ঘাটতি কিংবা মজুত শেষ হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও সাব-ডিলারের কাছে ডিএপি, টিএসপি ও ইউরিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সার মজুত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বাজার তদারকির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
জলঢাকা উপজেলার বালাগ্রামের কৃষক বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে ইউরিয়া ও টিএসপি সার প্রতি কেজি ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা এবং এমওপি ২০ টাকা দরে বিক্রির কথা। সে হিসাবে ৫০ কেজির প্রতি বস্তা ইউরিয়া ও টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি ১ হাজার টাকায় পাওয়ার কথা। কিন্তু খুচরা বাজারে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রসিদ ছাড়াই সার বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
একই এলাকার কৃষক বলেন, ‘তিন দিন চেষ্টা করার পর সার পেয়েছি, তাও চাহিদার তুলনায় কম। এভাবে চাষাবাদ করব কীভাবে? এত বেশি দামে সার কিনেও ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না।’
সারের পাশাপাশি কীটনাশক নিয়েও বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। তাঁদের অভিযোগ, শীতকালীন সবজির চারা ও গাছের রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরিচিত ব্র্যান্ডের কিছু কীটনাশকের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি নিম্নমানের ও ভেজাল কীটনাশক ব্যবহারের পরও পোকা দমন না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
কিশোরগঞ্জের আলুচাষি বলেন, ‘আমন ধান কাটার পরপরই আগাম আলুর বীজ রোপণ করতে হয়। এখন জমিতে সার দেওয়ার উপযুক্ত সময়, অথচ বাজারে প্রয়োজনমতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। বেশি দামে সার ও কীটনাশক কিনতে গিয়ে বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকায় পৌঁছাচ্ছে।’
তিনি জানান, জাতভেদে আলুর বীজ কিনতেই বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। সার বাবদ ৫ থেকে ৮ হাজার, জমি প্রস্তুত ও সেচে ৫ থেকে ৭ হাজার, কীটনাশক ও পরিচর্যায় ৩ থেকে ৫ হাজার এবং রোপণ থেকে আলু তোলা ও বস্তাবন্দি পর্যন্ত শ্রমিকের পেছনে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। তাঁর ভাষ্য, উৎপাদন খরচ এভাবে বাড়তে থাকলে লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়ে পড়বে।
আরেক সবজিচাষি বলেন, ‘কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের জিম্মি করা হচ্ছে বলে আমাদের মনে হচ্ছে। আমরা সরকার নির্ধারিত দামে পর্যাপ্ত সার চাই। উৎপাদনের শুরুতেই এমন সংকট চলতে থাকলে সবজির সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে বাজারদরেও।’
এদিকে অবৈধভাবে সার মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানোর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সংকটের প্রকৃত চিত্র, বাজারে সারের সরবরাহ এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মন্ডল বলেন, জেলায় সরকারিভাবে সারের পর্যাপ্ত বরাদ্দ রয়েছে। কোনো ডিলার বা ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে তাঁদের লাইসেন্স বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইউডি/রেজা


