প্রকাশিত: অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ১০:২৯ পিএম
ঢাকা টেস্টে আজ ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে বাংলাদেশের ৮ উইকেটের হারের পর আলোচনায় এসেছে আম্পায়ার্স কল। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পাঁচবার বাংলাদেশের বিপক্ষে গেছে এই সিদ্ধান্ত। প্রতিবারই উইকেট পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত হতাশ হতে হয়েছে স্বাগতিকদের। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর কাছেও বিষয়টি ছিল আক্ষেপের। তবে পাঁচবার আম্পায়ার্স কল পক্ষে না গেলেও হারের দায় আম্পায়ার কিংবা ভাগ্যের ওপর চাপাতে রাজি নন তিনি। বরং তাঁর চোখে বাংলাদেশের হারের বীজ বোনা হয়েছিল প্রথম ইনিংসেই!
১৭০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মেহেদী হাসান মিরাজের প্রথম ওভারেই দুবার এলবিডব্লুর আবেদন থেকে বেঁচে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আম্পায়ার্স কলের কারণে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পক্ষে আসেনি। পরেও এমন ঘটনা ঘটেছে আরও তিনবার। কখনো রিভিউ নিয়েও সফল হয়নি বাংলাদেশ, কখনো আবার রিপ্লেতে দেখা গেছে আম্পায়ার্স কল বিপক্ষে গেলে ব্যাটসম্যানকে ফিরতে হতো। সব মিলিয়ে পাঁচবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নের সময় সাংবাদিককে শুধরে দিয়ে শান্ত জানান, ঘটনাটি চারবার নয়, পাঁচবার। তবে এটিকে পরাজয়ের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন না বাংলাদেশ অধিনায়ক। তাঁর বক্তব্য, ‘আপনি যখন প্রতিপক্ষকে ১৭০ রানের লক্ষ্য দেবেন, তখন আম্পায়ারস কল পাঁচটার মধ্যে তিনটা আপনার পক্ষে দরকার হবে। দুর্ভাগ্যবশত আজকে তা হয়নি। এটা খেলার অংশ। আম্পায়ারকে আপনি দোষও দিতে পারবেন না। এটা ধরে নিতে হবে যে আমাদের ভাগ্যে ছিল না।’
তবে বারবার এমন সিদ্ধান্ত বিপক্ষে গেলে হতাশা তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক বলে মনে করেন শান্ত। সেই অনুভূতি লুকানওনি তিনি। বলেছেন, ‘যখন অনেক বেশি এমন হয় (আম্পায়ারস কল পক্ষে আসে না), মিথ্যা বলব না তখন স্বাভাবিকভাবেই একটু হতাশ লাগে।’
কিন্তু আম্পায়ার্স কল নিয়ে আক্ষেপ থাকলেও বাংলাদেশের হারের পেছনে বড় দায় নিজেদের পারফরম্যান্সের। প্রথম ইনিংসে ২৭ রানের লিড পাওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১৪২ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। একপর্যায়ে ৫৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কার্যত প্রতিপক্ষের হাতে তুলে দেয় স্বাগতিকেরা। আট নম্বরে ব্যাট করতে নামা নাঈম হাসানের ৫২ রানের ইনিংস না থাকলে পরিস্থিতি আরও বিব্রতকর হতে পারত।
তারপরও ১৭০ রানের লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশের আশা ছিল ম্যাচ জেতার। উইকেটের চরিত্র বিবেচনায় এই পুঁজি যথেষ্ট না হলেও লড়াই করার বিশ্বাস ছিল দলের। কিন্তু সেই বিশ্বাস বাস্তবে রূপ পায়নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানরা স্বাচ্ছন্দ্যে রান তুলে ম্যাচ শেষ করে দেন। এ প্রসঙ্গে শান্ত বলেছেন, ‘উইকেটের যে অবস্থা ছিল, আমাদের বিশ্বাস ছিল এই রান ডিফেন্ড করা সম্ভব। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তা হয়নি। অবশ্যই ওদেরকে একটু কৃতিত্ব দিতে হবে কিন্তু আমি বলব যে আমরা এই উইকেটে আরেকটু ভালো বল করতে পারতাম। আমরা খুব বেশি ভালো বল করিনি।’
অর্থাৎ আম্পায়ার্স কল বাংলাদেশের বিপক্ষে গেলেও প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার মতো বোলিং করতে পারেনি স্বাগতিকেরা। ১৭০ রানের লক্ষ্য রক্ষা করতে হলে শুরুতেই উইকেট নেওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের উদ্বোধনী জুটি ভাঙতেই বাংলাদেশের অপেক্ষা করতে হয়েছে অনেকটা সময়। জন ক্যাম্পবেল ও ব্রেন্ডন কিংয়ের ১১২ রানের জুটিই ম্যাচ থেকে ছিটকে দেয় বাংলাদেশকে। এমন পরিস্থিতিতে আম্পায়ার্স কলের সিদ্ধান্ত নিয়ে আক্ষেপ থাকলেও বোলিংয়ের ব্যর্থতা অস্বীকার ।
তবে শান্তর মতে, বাংলাদেশের প্রকৃত বিপর্যয় শুরু হয়েছিল আরও আগে, প্রথম ইনিংসে। প্রথম দিন ৩ উইকেটে ২১৩ রান নিয়ে শেষ করেছিল বাংলাদেশ। সেখান থেকে বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা তৈরি হলেও দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশনেই সাত উইকেট হারিয়ে ২৭২ রানে অলআউট হয়ে যায় দল। বিপরীতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংসে করে ২৭৩ রান। ভালো অবস্থানে থেকেও প্রতিপক্ষের সমান রান তুলতে পারেনি বাংলাদেশ।
এই জায়গাটিকেই ম্যাচের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে দেখছেন শান্ত, ‘আমার মনে হয়, এই ম্যাচে আমরা প্রথম ইনিংসেই ব্যাকফুটে চলে গেছি। উইকেট যেমন ছিল, তাতে প্রথম ইনিংসে আমরা যেভাবে দিন শেষ করেছি এবং ২১৩ রানে অলআউট হওয়ার পর প্রতিপক্ষ ২৭৩ রান করেছে, তাতে আমরা ম্যাচে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছি। আমরা জানতাম, পরের দিকে ব্যাটিং করাটা কঠিন হবে। তাই এত দূর না ভেবে বলব, ভুলটা আমরা প্রথম ইনিংসেই করেছি।’
প্রথম ইনিংসে ২১৩ রান নিয়ে দিন শেষ করার পর সেখান থেকে বড় লিড নেওয়ার সুযোগ ছিল বাংলাদেশের সামনে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারায় পরের ইনিংসে চাপ বেড়েছে। শান্তর বক্তব্যে তাই স্পষ্ট, ম্যাচের শেষ দিকে আম্পায়ার্স কল নিয়ে হতাশা থাকলেও পরাজয়ের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল নিজেদের ব্যাটিং ব্যর্থতায়।
এদিকে মিরপুরের উইকেট তৈরির পেছনে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার সমীকরণ কাজ করেছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। তবে শান্তর দাবি, ফাইনালের হিসাব মাথায় রেখে উইকেট তৈরি করা হয়নি। প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা এবং নিজেদের সুবিধার জায়গা বিবেচনা করেই কন্ডিশন নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘না, এরকম কোনো চিন্তা ছিল না। আমি ফাইনালের কথা প্রথম দিন সংবাদ সম্মেলনেও বলেছি একেকটা ম্যাচ আমরা চিন্তা করতেছি। প্রতিপক্ষের কী শক্তি আছে বা আমাদের কোন জায়গাটাতে আমরা বেটার করতে পারি, অপোনেন্টের কী উইক জোন-এগুলো চিন্তা করে কন্ডিশনটা সেট করা হয়েছে। এবং আমি বলব যে প্রথম দুই দিন যদি আপনি উইকেটটা দেখেন, মোটামুটি খুব ভালোই ছিল। আমরা শুরুতে হয়তো অত ভালো ব্যাটিং করিনি ভালো স্টার্ট পাওয়ার পর। বাট আমার মনে হয় না যে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল চিন্তা করে কন্ডিশনটা এরকম বানানো হয়েছে।’
শান্তর ব্যাখ্যায় তিনটি বিষয় পরিষ্কার-আম্পায়ার্স কল নিয়ে হতাশা আছে, উইকেট নিয়ে দলের আলাদা কোনো কৌশলগত অভিযোগ নেই এবং পরাজয়ের বড় কারণ নিজেদের ব্যাটিংয়ের ব্যর্থতা। কিন্তু ব্যাখ্যার চেয়েও বড় প্রশ্ন, ভালো অবস্থানে থেকে কেন বাংলাদেশ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারল না? পাঁচবার আম্পায়ার্স কল বিপক্ষে গেলেও প্রথম ইনিংসে নিজেদের সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারলে ম্যাচের চিত্র ভিন্ন হতে পারত।
দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ ম্যাচ শুরু ৫ নভেম্বর, সিলেটে। প্রথম টেস্টের ব্যাটিং ব্যর্থতা কাটিয়ে সিরিজে সমতা ফেরানোই এখন বাংলাদেশের সামনে প্রধান লক্ষ্য!
ইউডি/রেজা


