প্রকাশিত: অক্টোবর ৪, ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম
এশিয়ান গেমস শেষ হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে যেন ম্যাচ এখনও শেষ হয়নি! মাঠের ফলাফল ইতোমধ্যে লেখা হয়ে গেছে-বড় কোনো সাফল্য নেই, ক্রিকেটের মতো সম্ভাবনাময় ডিসিপ্লিনও ফিরেছে পদকহীন। এখন শুরু হয়েছে অন্য এক লড়াই-কেন এমন হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার!
জাপানে অনুষ্ঠিত ২০২৬ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক করতে গঠন করা হয়েছে বিশেষ মূল্যায়ন কমিটি। অর্থাৎ এবার শুধু ফলাফল দেখে হতাশ হওয়ার বদলে ফলাফলের পেছনের গল্পটিও খুঁজে দেখতে চায় সরকার।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে আন্তর্জাতিক আসরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের দর্শনে। এত দিন অনেক ক্ষেত্রে বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াটাই যেন সাফল্যের একটি আলাদা মানদণ্ড ছিল। এবার সেই ধারণা থেকে সরে এসে সরাসরি পদক জয়ের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
আমিনুল হক বলেন, ‘এশিয়ান গেমসে এবারের পারফরম্যান্স অত্যন্ত হতাশাজনক ছিল। এই ব্যর্থতার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান ও ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণের জন্য ইতিমধ্যে একটি বিশেষ মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারের বর্তমান লক্ষ্য কেবল কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা নয়, বরং সরাসরি পদকের জন্য লড়াই করা। যেসব ইভেন্টে বাংলাদেশের পদক জয়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, সেগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হবে।’
এবারের আসরে বাংলাদেশের একমাত্র পদক এসেছে উশু থেকে। নারী ৫২ কেজি ওজন শ্রেণিতে ব্রোঞ্জ জিতেছেন জিন্নাত আক্তার। একটি ব্রোঞ্জই হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের পুরো আসরের পদক-পরিসংখ্যান।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ক্রিকেটে। এশিয়ান গেমসে পুরুষ ক্রিকেটে প্রতিবারই কোনো না কোনো পদক জিতেছিল বাংলাদেশ। ২০১০ সালে এসেছিল সোনা। পরের আসরগুলোতেও পদকের ধারাবাহিকতা ছিল। এবার সেই ধারাটিই ভেঙে গেল। পাকিস্তানের কাছে সেমিফাইনালে হারের পর ব্রোঞ্জের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার কাছেও ৬৩ রানে হেরে চতুর্থ হয়ে ফিরেছে লিটন দাসের দল। যে ডিসিপ্লিনকে বাংলাদেশের অন্যতম নিশ্চিত পদকের জায়গা হিসেবে ভাবা হয়েছিল, সেখানেই এবার শূন্য হাতে ফেরার ঘটনা তাই আলাদা করে ভাবাচ্ছে।
তবে প্রশ্ন শুধু ক্রিকেটে আটকে নেই। অন্যান্য ডিসিপ্লিনেও প্রত্যাশিত ফল আসেনি। ফলে একটি পদক দিয়ে সামগ্রিক চিত্র ঢাকার সুযোগ নেই। বরং সেই একটি ব্রোঞ্জই উল্টো বড় প্রশ্নটি সামনে এনেছে-যে বিপুল সময়, অর্থ ও মানবসম্পদ আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায় ব্যয় হচ্ছে, তার কতটা পরিকল্পিতভাবে ফলাফলে রূপান্তরিত হচ্ছে?
এই প্রশ্নের সঙ্গে এবার যুক্ত হচ্ছে অর্থের হিসাবও। ক্রীড়াবিদদের জন্য সরকার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বলে জানিয়েছেন আমিনুল হক। এর আওতায় ক্রীড়া কার্ডপ্রাপ্ত খেলোয়াড়দের ভাতা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পারফরম্যান্সভিত্তিক মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩০০ জন ক্রীড়াবিদ ক্রীড়া কার্ড পেয়েছেন; পর্যায়ক্রমে এই সংখ্যা ৫০০-তে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এখানেও নতুন একটি শর্ত যোগ হচ্ছে-পারফরম্যান্স। প্রতি চার মাস পরপর ক্রীড়াবিদদের মূল্যায়ন করে তালিকা হালনাগাদ করা হবে। এরই মধ্যে ৩১ জনকে ভাতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, আবার নতুন করে যোগ্য ও ভালো পারফরম্যান্স করা খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে। সরকারি সহায়তাকে এবার শুধু ভাতা হিসেবে না দেখে পারফরম্যান্সের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ক্রীড়াবিদদের মাঠের বাইরের সুবিধা নিয়েও পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। রেল, বিমান ও সড়কপথে তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য, আর্থিক বা নাগরিক সুবিধার অভাবে যেন একজন ক্রীড়াবিদ প্রস্তুতিতে পিছিয়ে না পড়েন।
তবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে মাঠে। আগামী পাঁচ বছর পর অলিম্পিকে পদকের জন্য লড়াই করার লক্ষ্য সামনে রেখে বছরব্যাপী প্রশিক্ষণের কথা বলা হচ্ছে। এশিয়ান গেমসসহ বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাকে সামনে রেখে প্রস্তুতি হবে দীর্ঘমেয়াদি। কিন্তু পরিকল্পনার তালিকা যতই দীর্ঘ হোক, তার মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত হবে স্টপওয়াচ, স্কোরবোর্ড আর পদকের মঞ্চেই।
সেই কারণেই বিশেষ মূল্যায়ন কমিটির কাজটি গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি শুধু কে কত রান করল, কে কত গোল খেল বা কে প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়ল-এই হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া কঠিন হবে। বরং খুঁজতে হবে প্রস্তুতির ঘাটতি কোথায়, কোচিং কাঠামো কতটা কার্যকর, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মানের সঙ্গে প্রশিক্ষণের কতটা সামঞ্জস্য আছে, প্রতিভা বাছাই কতটা সঠিক এবং সম্ভাবনাময় ডিসিপ্লিনগুলোতে বিনিয়োগ আদৌ প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট কি না!
ইউডি/রেজা


