মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর, ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত বুকে নিয়ে ‘বীরাঙ্গনা’ ফুলমতির শেষ বিদায়

উত্তরদক্ষিণ ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২, ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম

মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত বুকে নিয়ে ‘বীরাঙ্গনা’ ফুলমতির শেষ বিদায়

না ফেরার দেশে চলে গেলেন গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের ‘বীরাঙ্গনা’ রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি। বার্ধক্য ও নানা শারীরিক জটিলতায় দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকার পর গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। এদিকে শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় নিজ বাড়িতে ফুলমতির শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় লাল-সবুজের পতাকায় শেষ বিদায় জানানো হয়।

ফুলমতির ছেলে মনিরাজ কুমার জানান, দীর্ঘদিন ধরে তার মা বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। প্রায় দুই বছর আগে ব্রেইন স্ট্রোক করেন।

এতে ডান হাত-পা অবশ হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি প্রায় পুরোপুরি শয্যাশায়ী ছিলেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজ ঘরেই মারা যান তিনি। 

লেখক ও গবেষক জহুরুল কাইয়ুম সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক প্রকাশনা ‘হৃদয়ে একাত্তর’-এ ফুলমতির জীবনের কিছু তথ্য লিপিবদ্ধ আছে।

সেখানে তাকে ‘ফুলমতি রানী’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ফুলমতির বাবার নাম অর্জুন রবিদাস, মা ফু রানী রবিদাস। সাদুল্লাপুর থানার জামালপুর ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার সংসারে এক মেয়ে সপ্তমী এবং চার ছেলে। 

সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের উত্তরপাড়ায় বাড়ি ছিল ফুলমতির। তার স্বামী প্রয়াত কুশিরাম সরকার ফসিয়ার। স্বামী-সন্তান নিয়ে অত্যন্ত দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন তিনি। ১৯৮৮ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের আগলে রেখে তাকে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

পরিবারের সদস্য জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একদিন পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ফুলমতিদের বাড়িতে এসে তাকে ঘর থেকে বের করে নির্মম নির্যাতন করে। 

স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন ফুলমতি। পরে ২০১৬ সালে মার্চে তিনি   বীরাঙ্গনা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান। তবে এ জন্য তাকে ধরনা দিতে হয়েছে সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। অপেক্ষা করতে হয়েছে পুরো ৪৫ বছর। 

২০১০ সালে ঢাকার স্টেপস্ টুয়ার্ডস্ ডেভেলপমেন্টের সহযোগিতায় স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য জেনেসিস ও উপজেলা সামাজিক উদ্যোক্তা দল তাকে সম্মাননা জানায় এবং কিছু উপহার দেয়।

সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে ফুলমতির ত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস অত্যন্ত বেদনাদায়ক। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন তিনি স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। অনেক চেষ্টা ও আবেদনের পর ২০১৬ সালে তা মেলে।

আজমী আরও বলেন, শয্যাশায়ী অবস্থায় ফুলমতির চিকিৎসায় সরকারি পর্যায় থেকে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি। শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন এই সংগ্রামী নারী। 

তিনি বলেন, তাঁর মৃত্যুতে আমরা একজন অসম সাহসী এক নারীকে হারালাম।

স্থানীয় বলছেন, ফুলমতি শুধু একজন নারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তার নির্যাতন, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। তার স্মৃতি সংরক্ষণে সমাধিস্থলে একটি স্মৃতিফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

ইউডি/রেজা

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ

Advertisement
Link copied!